১৭ বৈশাখ, ১৪৩৩

৩০ এপ্রিল, ২০২৬

বাংলাদেশে গণতন্ত্রের তৃতীয় তরঙ্গ: বিএনপি ও অন্যান্য স্টেকহোল্ডারদের দায়

বাপ্পা আজিজুল প্রকাশিত: মে ৭, ২০২৫, ৫:৩৩ অপরাহ্ন
বাংলাদেশে গণতন্ত্রের তৃতীয় তরঙ্গ: বিএনপি ও অন্যান্য স্টেকহোল্ডারদের দায়

'গণতন্ত্রের তরঙ্গ' (waves of democracy), স্যামুয়েল পি হান্টিংটন (1991) প্রবর্তিত রাষ্ট্রবিজ্ঞানের একটি পরিচিত শব্দ। হান্টিংটন ৩টি তরঙ্গ চিত্রিত করেছেন তাঁর 'দ্য থার্ড ওয়েভ: ডেমোক্রেটিজেশন ইন দ্য টোয়েন্টিথ সেঞ্চুরি' বইয়ে। প্রথম দীর্ঘ তরঙ্গ, ১৮২০-এর দশকে শুরু হয়ে ১৯২০-এর দশকের কাছাকাছি শেষ হয়েছিল, দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পরে ২য় এবং ১৯৭০-এর দশকে ৩য় বা শেষ তরঙ্গ উপস্থিত হয়; অপরদিকে টরন্টো বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক গুনিস্কি (Gunitsky) ১৩টি তরঙ্গ উল্লেখ করেছেন, ১৮ শতকের আটলান্টিক বিপ্লব থেকে সাম্প্রতিক আরব বসন্ত পর্যন্ত।


বাংলাদেশে, ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধের পর, ১৯৭৫ এর  সিপাহী-জনতা বিপ্লবের মাধ্যমে গণতন্ত্রীকরণ শুরু হয়। সুতরাং, এটি অত্যুক্তি নয়, রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের নেতৃত্বে গণতন্ত্রের প্রথম তরঙ্গ শুরু হয়, যিনি বহুদলীয় রাজনীতি, সংবাদপত্রের স্বাধীনতা, বাকস্বাধীনতা পুনরুদ্ধার করেছিলেন। বাজার উন্মুক্তকরণ এবং জবাবদিহিতা নিশ্চিত করেন, পরবর্তীকালে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি) প্রতিষ্ঠা করেন। বাংলাদেশে গণতন্ত্রের যাত্রা মসৃণ ছিল না, আজতক দেশটি ২৯টির মতো সামরিক অভ্যুত্থান (সফল কিংবা ব্যর্থ) এবং ফ্যাসিবাদের দীর্ঘ সময়ের মধ্যে দিয়ে গেছে।

যাইহোক, ১৯৯০ সালে, দীর্ঘ সংগ্রামের মাধ্যমে খালেদা জিয়া এবং শেখ হাসিনার (পরে ফ্যাসিবাদী হয়ে ওঠে) নেতৃত্বে গণতন্ত্রপন্থী গণঅভ্যুত্থানের পর জেনারেল এরশাদ পদত্যাগ করতে বাধ্য হন এবং গণতন্ত্রের দ্বিতীয় তরঙ্গ শুরু হয়। প্রকৃতপক্ষে স্বৈরাচারের পতনের পর গণতন্ত্র পুনঃপ্রতিষ্ঠায় সবচেয়ে বড় অবদান ছিল বিএনপির। কিন্তু ওয়ান-ইলেভেনে গণতন্ত্র ধর্ষিত হয় এবং ২০১০-এর দশকে শেখ হাসিনার হাত ধরে ফ্যাসিবাদ চেপে বসে। ১৫ বছরের ফ্যাসিবাদী শাসনের পর, ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট, ছাত্র-জনতা রক্তক্ষয়ী সংগ্রামে শাসকগোষ্ঠীকে উৎখাত করে। সন্দেহ নেই, এখানেই গণতন্ত্রের তৃতীয় তরঙ্গের সূচনা। 
বাংলাদেশ এবং তাদের জোটের বৃহত্তম দল হিসেবে বিএনপি, বৈষম্য বিরোধী ছাত্র আন্দোলন, জামায়াত এবং অন্যান্য স্টেকহোল্ডারদের বাংলাদেশের প্রতিটি গণতান্ত্রিক সম্ভাবনার সংস্কার ও বিনির্মাণে প্রধান ভূমিকা রয়েছে। ইতিহাস পর্যালোচনা অনুযায়ী এটি প্রতীয়মান যে, জনগণের গভীর স্পন্দন বুঝে বিএনপিকে আগের মতোই নেতৃত্ব ও দায়িত্ব কাঁধে তুলে নিতে হবে।
বাংলাদেশে আরও শক্তিশালী গণতন্ত্র গড়ে তোলার ক্ষেত্রে বিএনপি এবং অন্যান্য মূল স্টেকহোল্ডারদের দায়িত্বের একটি রূপরেখা এখানে দেওয়া হল: 

১. বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি) এর দায়িত্ব 
গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ায় একটি প্রধান দল হিসেবে বিএনপির গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রয়েছে: 
ক. দলীয় আদর্শ ও ঐক্যকে শক্তিশালী করা: সুশাসন, দুর্নীতি বিরোধী এবং অর্থনৈতিক সংস্কারের মতো বিষয়গুলোকে কেন্দ্র করে সুস্পষ্ট গণতান্ত্রিক এজেন্ডা নিয়ে ঐক্যবদ্ধ ফ্রন্ট উপস্থাপনে বিএনপিকে কাজ করতে হবে। 

খ. গঠনমূলক সমালোচনা: প্রতিবাদের রাজনীতির ওপর নির্ভর না করে বিএনপির উচিত উপদেষ্টা ফোরামের সঙ্গে গঠনমূলক সংলাপ করা। তারা সংবিধান, মানবাধিকার এবং আইনের শাসনের মতো বিষয়ে সরকারকে জবাবদিহি করতে তাদের অবস্থান ও সামর্থ্যের সদ্ব্যবহার করতে পারে। 

গ. শান্তিপূর্ণ রাজনৈতিক সংহতি প্রচার: রাজনৈতিক সহিংসতা প্রায়ই বাংলাদেশের গণতান্ত্রিক দৃশ্যপটকে ক্ষতিগ্রস্ত করেছে। বিএনপিকে শান্তিপূর্ণ ও গণতান্ত্রিক প্রতিবাদ করতে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ হওয়া উচিত, ভিন্নমতের প্রতি আইনি ও শান্তিপূর্ণ উপায়ে ফোকাস করা উচিত। 

ঘ. গণতান্ত্রিক রীতি-নীতিকে উৎসাহিত করা: সুষ্ঠু অভ্যন্তরীণ দলীয় নির্বাচন, স্বচ্ছ সিদ্ধান্ত গ্রহণের প্রক্রিয়া এবং যুব ও নারীদের অংশগ্রহণের মাধ্যমে বিএনপিকে অধিকতর গণতান্ত্রিক মূল্যবোধ প্রদর্শন ও চর্চা করতে হবে। 

ঙ. জাতীয় পরিচয়কে সমুন্নত রাখা: বিএনপিকে তার বাংলাদেশী মুসলিম জাতীয়তাবাদী অবস্থানকে সাহসের সাথে সমুন্নত রাখতে হবে। ইসলামপন্থী নেতা, বুদ্ধিজীবীদের এগিয়ে নিয়ে আসতে হবে, সুযোগ দিতে হবে। বিএনপির উচিত আন্তর্জাতিক মুসলিম সম্প্রদায়ের সঙ্গে আরও ভালো সম্পর্ক ও বোঝাপড়া তৈরি করা।

২. বাংলাদেশের ক্ষমতাসীন সরকারের দায়িত্ব 
ক. অবাধ ও নিরপেক্ষ নির্বাচন নিশ্চিত করা: গণতন্ত্রের বিকাশের জন্য, সরকারকে অবশ্যই নির্বাচন অবাধ, সুষ্ঠু এবং স্বচ্ছ নিশ্চিত করতে হবে। বিশেষ করে একটি নিরপেক্ষ নির্বাচন কমিশন গঠন এবং সব রাজনৈতিক দলের অংশগ্রহণের সুযোগ করে দেয়া। 
খ. বিরোধী মত এবং গণমাধ্যমের স্বাধীনতার প্রতি শ্রদ্ধা: সরকারের উচিত বিরোধী মতগুলোর জন্য জায়গা দেয়া এবং ভিন্নমতকে নীরব করার জন্য বা গণমাধ্যমের স্বাধীনতা খর্ব করার জন্য রাষ্ট্রীয় সম্পদ বা প্রভাব ব্যবহার করা থেকে বিরত থাকা। 
গ. শাসন ​​ব্যবস্থার উন্নতি এবং দুর্নীতি হ্রাস: জনগণের আস্থা অর্জন এবং গণতন্ত্রকে গতিশীল করার জন্য পুলিশ ও জনপ্রশাসনকে শক্তিশালী করা এবং দুর্নীতি রোধ করা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। 
ঘ. বিচার বিভাগের স্বাধীনতা এবং আইনের শাসন: বিচার বিভাগের স্বাধীনতা এবং আইনের শাসন নিশ্চিত করা, নাগরিকদের অধিকার রক্ষা এবং গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠানের প্রতি আস্থা তৈরি করা।

৩. অন্যান্য রাজনৈতিক দলের দায়িত্ব 
জামায়াতসহ অন্যান্য রাজনৈতিক দলগুলো, ছোট হোক বা বড় ব্লকের সাথে জোটবদ্ধ হোক, গণতান্ত্রিক বৈচিত্র্যকে সমৃদ্ধ করতে মুখ্য ভূমিকা পালন করতে পারে। যেমন-
ক. কোয়ালিশন বিল্ডিং: ছোট দলগুলি বহু-দলীয় জোট এবং ক্রস-পার্টি সংলাপকে উৎসাহিত করতে পারে, যা বিভিন্ন নতুন নতুন দৃষ্টিভঙ্গি সামনে আনতে পারে এবং আরও ভারসাম্যপূর্ণ রাজনৈতিক পরিবেশ তৈরি করতে পারে। 
খ. সংস্কারের পক্ষে চাপ সৃষ্টি: এই দলগুলো রাজনীতিতে অর্থ ও ক্ষমতার প্রভাব কমাতে এবং গণতান্ত্রিক রীতি-নীতিকে শক্তিশালী করতে রাষ্ট্র মেরামত, নির্বাচনী ও রাজনৈতিক সংস্কারের পক্ষে ওকালতি ও চাপ সৃষ্টি করতে পারে। 
গ. বৈষম্য বিরোধী ছাত্র আন্দোলন ও অন্যান্য ছাত্রসংগঠন যথাসম্ভব নিজেদের সুগঠিত করে আগামির কাঙ্ক্ষিত বাংলাদেশের জন্য নেতৃত্ব তৈরি ও যোগানের 'পাওয়ার হাউস' হিসেবে কাজ করতে হবে। 

৪. সুশীল সমাজ এবং মিডিয়ার দায়িত্ব 
ক. নাগরিক শিক্ষার প্রচার: সুশীল সমাজ গণতান্ত্রিক মূল্যবোধ এবং নাগরিক শিক্ষার প্রচারে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করতে পারে, যা নাগরিকদের গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ায় গঠনমূলকভাবে জড়িত হতে উৎসাহিত করতে পারে। 
খ. স্বাধীন সাংবাদিকতা: গণমাধ্যমকে সুষম, স্বাধীন প্রতিবেদন প্রদান করতে হবে যাতে নাগরিকদের অবগত থাকে এবং সরকারকে জবাবদিহি করতে হয়। অনুসন্ধানী সাংবাদিকতা দুর্নীতি ও ক্ষমতার অপব্যবহারের মতো বিষয়গুলোকে প্রকাশ করতে পারে। 
গ. মানবাধিকারের অ্যাডভোকেসি: সুশীল সমাজের সংগঠনগুলো মানবাধিকার সুরক্ষার পক্ষে ওকালতি করতে পারে, সংখ্যালঘু ও প্রান্তিক গোষ্ঠীগুলোকে সমর্থন করতে পারে এবং সরকার বা রাজনৈতিক অংশীজনদের দ্বারা মানবাধিকার লঙ্ঘন পর্যবেক্ষণ করতে পারে।

৫. আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের দায়িত্ব 
ক. গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠানগুলোকে সমর্থন করা: আন্তর্জাতিক অংশীদাররা বাংলাদেশে গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠানকে শক্তিশালী করার জন্য সহায়তা প্রদান করতে পারে, যেমন- নির্বাচন কমিশন ও বিচার বিভাগকে প্রযুক্তিগত সহায়তা। 
খ. সুষ্ঠু অনুশীলনের প্রচার: আন্তর্জাতিক পর্যবেক্ষক এবং সংস্থাগুলো নির্বাচন পর্যবেক্ষণ এবং যে কোনও অনিয়মে সোচ্চার হওয়া, ন্যায্যতা এবং স্বচ্ছতা নিশ্চিতকরণে সহযোগিতা করতে পারে। 
গ. সংলাপে উৎসাহিত করা: আন্তর্জাতিক অংশীজনেরা রাজনৈতিক সংকটে মধ্যস্থতাকারী হিসেবে কাজ করতে পারে, দলগুলোর মধ্যে সংলাপকে উৎসাহিত করতে পারে। 
পরিশেষে বলা যায়, বাংলাদেশে অভিজাত গণতন্ত্রের চেয়ে অংশগ্রহণমূলক গণতন্ত্র প্রয়োজন। এজন্য বাংলাদেশে একটি স্থিতিশীল ও বিকাশমান গণতন্ত্রের লক্ষ্যে বিএনপি, জামায়াত এবং অন্যান্য রাজনৈতিক অংশীজন, সুশীল সমাজ এবং আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের ভারসাম্যপূর্ণ ও সহযোগিতামূলক দায়িত্ব পালন করতে হবে। পারস্পরিক শ্রদ্ধাবোধ গড়ে তোলা, শান্তিপূর্ণ রাজনীতির প্রচার করা এবং ব্যক্তিগত বা দলীয় লাভের চেয়ে গণতান্ত্রিক নীতিকে অগ্রাধিকার দেয়া বাংলাদেশে আরও টেকসই গণতান্ত্রিক ভবিষ্যতের পথ প্রশস্ত করবে।