৩১ মে। বিশ্ব তামাক মুক্ত দিবস। এবারের (২০২৫) প্রতিপাদ্য বিষয়: Unmasking the Appeal: Exposing Industry Tactics on Tobacco and Nicotine Products। প্রতিবছরের ন্যায় এবারও নীরবে-নিভৃতে দিবসটি উদযাপিত হবে। হাতেগোনা দু-চারটে সামাজিক সংগঠন হয়ত র্যালি, সেমিনার, ওয়েবিনার করবে, তামাকের স্বাস্থ্যগত ক্ষতির দিক নিয়ে আলাপ-আলোচনা হবে। তামাক, একদিকে জনস্বাস্থ্যের জন্য মারাত্মক হুমকি, অন্যদিকে এটি একটি লাভজনক শিল্প যা রাষ্ট্রীয় রাজস্বে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। এই দ্বৈত বাস্তবতা বাংলাদেশে একটি বিতর্কিত রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট সৃষ্টি করেছে—যেখানে নীতি প্রণয়ন এবং বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে একদিকে জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞদের আহ্বান, অন্যদিকে তামাক কোম্পানিগুলোর প্রভাবশালী লবিংয়ের চাপ পরস্পরের মুখোমুখি অবস্থান নিয়েছে। বলা বাহুল্য, তামাককে ঘিরে রাজনৈতিক অর্থনীতি গড়ে ওঠেছে এবং বাংলাদেশে রাজনীতি ও সংস্কৃতির মধ্যে তামাকের অবস্থান ক্রমাগত গভীর থেকে গভীরতম হয়ে ওঠেছে।
১. তামাক শিল্পের আর্থিক বলয় ও রাজনৈতিক প্রভাব
বাংলাদেশে তামাক শিল্প বিশেষত বিটিসি (Bangladesh Tobacco Company/British American Tobacco Bangladesh) অর্থনীতির একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ। ২০২২-২৩ অর্থবছরে বিটিসি কর এবং ভ্যাট বাবদ প্রায় ৩০,০০০ কোটি টাকার বেশি রাজস্ব দিয়েছে (NBR, 2023)। এই রাজস্ব নির্ভরতা সরকারের নীতিনির্ধারকদের ওপর চাপ তৈরি করে, যার ফলে তামাক কোম্পানিগুলোর ওপর কঠোর আইন প্রয়োগে দ্বিধা দেখা যায়।
একাধিক গবেষণায় দেখা গেছে যে, তামাক কোম্পানিগুলো বিভিন্নভাবে রাজনীতিবিদ, আমলা ও প্রভাবশালী মহলের সঙ্গে সম্পর্ক গড়ে তোলে। Transparency International Bangladesh (TIB) এক রিপোর্টে উল্লেখ করে, তামাক কোম্পানিগুলো বাজেট ঘোষণার পূর্বে অর্থ মন্ত্রণালয়ের সঙ্গে সরাসরি ‘লবিং’ করে (TIB, 2019)। এতে তারা 'কর নীতি'কে প্রভাবিত করতে সক্ষম হয়। রাজনৈতিক দলসমূহের কর্মসূচি বাস্তবায়ন ও মনোনয়ন বাণিজ্যেও তামাক ব্যবসায়ীদের দৌরাত্ম্য লক্ষ্য করা যায়। এমনকি দলীয় কমিটি, এমপি প্রার্থিতায় উচ্চকিত দেখা যায় চিহ্নিত তামাক ও মাদক ব্যবসায়ীদের।
২. কৃষি রাজনীতিতে তামাক: কৃষকের কণ্ঠ হারানো
তামাক চাষ কৃষকদের জন্য অনেকসময় একমাত্র অবলম্বন হয়ে দাঁড়ায়, বিশেষ করে উত্তরাঞ্চলের কুড়িগ্রাম, লালমনিরহাট ও বান্দরবানের মতো এলাকায়। বেসরকারি উন্নয়ন সংস্থা UBINIG-এর তথ্যমতে, তামাক চাষ মাটি ও পরিবেশের মারাত্মক ক্ষতি করে এবং কৃষকদের খাদ্যশস্য থেকে দূরে সরিয়ে দেয় (UBINIG, 2021)। তবুও তামাক কোম্পানিগুলোর চুক্তিভিত্তিক চাষ, বীজ, সার ও আগাম অর্থ প্রদানের মাধ্যমে কৃষকরা এই চক্রে আটকে পড়ে।
রাষ্ট্রীয় পর্যায়ে কোনো শক্তিশালী ‘অলটারনেটিভ ক্রপ সাবসিডি’ না থাকায় কৃষকরা তামাক থেকে বেরিয়ে আসার সাহস পায় না। ফলে এটি কৃষিনীতির রাজনৈতিক ব্যর্থতার প্রতীক হয়ে দাঁড়ায়। এই অঞ্চলের স্থানীয়, জাতীয় ও আন্তর্জাতিক ভূরাজনৈতিক গতি নির্ধারণের অন্যতম নেয়ামকও তামাক, আফিম ও অন্যান্য মাদক চাষ এবং চোরাচালান।
৩. জনস্বাস্থ্য বনাম রাষ্ট্রীয় রাজস্ব: দ্বন্দ্বময় বাস্তবতা
বাংলাদেশে বছরে প্রায় ১ লাখ ৬১ হাজার মানুষ তামাকজনিত রোগে মারা যায় (WHO Bangladesh, 2023)। অথচ সরকারের দৃষ্টিভঙ্গি রাজস্ব ও জনস্বাস্থ্যের মাঝখানে দ্বিধান্বিত। ২০০৫ সালের "তামাক নিয়ন্ত্রণ আইন" সংশোধন করে ২০১৩ সালে বিজ্ঞাপন নিষিদ্ধ করা হলেও, বাস্তবে অনেক মাধ্যমেই (যেমন- রেডিও, নাটক, অনলাইন ভিডিও) প্রকাশ্যে কিংবা গোপনে তামাক পণ্যকে প্রচার করে যাচ্ছে। সরিষার মধ্যে ভূত! প্রকাশ্যে ধূমপানের জরিমানা কে করবে? আইন প্রয়োগকারী সংস্থার সদস্যদের মধ্যে তামাকের প্রকোপ কয়েকগুণ বেশি। তারাও নিকট অতীতে ফ্যাসিবাদের এনাবলার হিসেবে ভূমিকা রেখেছে যার ভিত্তিই হল তামাকের রাজনীতি। স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় তামাক বিরোধী পদক্ষেপ নিতে চাইলেও, শিল্প ও অর্থ মন্ত্রণালয় প্রায়ই তাতে অন্তরায় হয়ে দাঁড়ায়। উদাহরণস্বরূপ, ২০২১ সালে প্রস্তাবিত "তামাক নিয়ন্ত্রণ আইন ২০২১" নিয়ে জোর আলোচনা হলেও, তাতে এখনও দৃশ্যমান অগ্রগতি হয়নি—এটি রাজনৈতিক সদিচ্ছার ঘাটতির প্রমাণ। জেলা পর্যায়ে 'তামাক নিয়ন্ত্রণ আইন বাস্তবায়ন' টাস্কফোর্স কমিটি রয়েছে। তারা কেবল কর্মশালা, মিটিং-সিটিং-ইটিং এর মধ্যে সীমাবদ্ধ রয়েছে। আয়রনি ব্যাপার হল- এই টাস্কফোর্স কমিটির অধিকাংশ সদস্যই তামাকসেবী।
৪. তরুণ সমাজ: সাংস্কৃতিক রাজনীতি ও রাজনীতির সংস্কৃতি
তামাক কোম্পানিগুলো নানা সময় তরুণদের টার্গেট করে প্রচার চালায়। ধূমপানকে ‘স্টাইল’ বা ‘মেনলিনেস’-এর প্রতীক হিসেবে উপস্থাপন করে ব্র্যান্ডিং করা হয়। যদিও খোলাখুলি বিজ্ঞাপন নিষিদ্ধ, তথাপি ব্র্যান্ডিংয়ের মাধ্যমে তা সোশ্যাল মিডিয়া, মিউজিক ভিডিও, কিংবা ইনফ্লুয়েন্সার মার্কেটিং-এর ভেতর প্রবেশ করে। এই প্রক্রিয়া একটি সাংস্কৃতিক রাজনীতি—যেখানে তামাককে তরুণদের পরিচয়ের অংশ করে তোলা হয়। এই সাংস্কৃতিক যুদ্ধের পেছনেও রয়েছে সুপরিকল্পিত লবিং ও অর্থনৈতিক শক্তির প্রভাব। বাংলাদেশের শিক্ষা প্রতিষ্ঠান ও প্রগতিশীল সাংস্কৃতিক অঙ্গন বা আখড়াগুলোতে ধূমপান একটি বিশেষ পরিচিতি ও সুবিধা বহন করে। কেউ ধূমপান না করলেই বরং তাকে ধর্মীয় মৌলবাদী হিসেবে চিহ্নিত করা হয়। নেমে আসে নির্যাতন। তাই অনেক অধূমপায়ীকেও পিঠ বাঁচানোর জন্য সিগারেটের প্যাকেট, লাইটার কিংবা দিয়াশলাই বুক পকেটে করে ঘুরতে হয়। বাংলাদেশে শিক্ষা প্রতিষ্ঠান এবং পাড়া মহল্লায় কিশোর গ্যাং বা তরুণদের রাজনৈতিক দলে ভিড়ানোর প্রথম এবং প্রধানতম হাতিয়ার হল তামাক। রাজনৈতিক সন্ত্রাস, উন্মাদনা জাগাতেও ব্যবহার হয় তামাক ও অন্যান্য মাদক। ৩৬ জুলাই পরবর্তী উত্তর ফ্যাসিবাদ, উত্তর শাহবাগ সময়েও এই রাজনৈতিক-সাংস্কৃতিক তামাক নীতির খুব বেশি হেরফের হয়নি। নতুন বন্দোবস্ত তামাকের রাজনীতিকে কিভাবে ডিল করবে তা নিয়ে এখনও আমরা কোন ধারণা-প্রস্তাবনা পাইনি।
৫. নীতিনির্ধারণে কর্পোরেট প্রভাব ও রাজনৈতিক দ্বৈততা
তামাক কোম্পানিগুলোর উচ্চপদস্থ কর্মকর্তারা প্রায়ই সরকারি দপ্তরের সঙ্গে সরাসরি যোগাযোগ রাখে। এক গবেষণায় উঠে এসেছে, বিটিসির কর্মকর্তারা কখনো কখনো জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (NBR) ও অর্থ মন্ত্রণালয়ের সভায় অংশ নেন, যেখানে তামাকজাত পণ্যের কর হার নিয়ে আলোচনা হয় (Prothom Alo, 2021)। এটি সুশাসনের গুরুতর ব্যত্যয়। জাতীয় নীতিমালায় WHO-এর FCTC Article 5.3 অনুযায়ী তামাক কোম্পানির সঙ্গে সরকারের যোগাযোগ সীমিত রাখার কথা বলা হলেও, বাস্তবে বাংলাদেশে এই ধারা কার্যত উপেক্ষিত হয়। এবং কর্পোরেট দায়বদ্ধতার দোহাই দিয়ে তামাক কোম্পানি ও ব্যবসায়ীরা যৎসামান্য দান-খয়রাত করে, ত্রাণ তহবিলে অর্থ জমা দেয়, আর আমরা ভক্তিতে গদগদ হই। তাদেরকে মানবতার ফেরিওয়ালা তকমা দেই।
বাংলাদেশে তামাক একদিকে অর্থনৈতিক বাস্তবতা, অন্যদিকে রাজনৈতিক বাধ্যবাধকতা। তামাকের রাজনীতি এখানে শুধু চাষ, কর বা বিজ্ঞাপনে সীমাবদ্ধ নয়—এটি গভীরভাবে রাষ্ট্রের নীতিনির্ধারণ ও রাজনৈতিক সদিচ্ছার পরীক্ষার ক্ষেত্র হয়ে দাঁড়িয়েছে। তামাককে মাইনাস করে নিজেদের রাজনৈতিক লাঠিয়াল বাহিনী পালন কী আদৌ সম্ভব? এই বাস্তবতা থেকে বের হয়ে আসতে হলে প্রয়োজন শক্তিশালী ও বাস্তবভিত্তিক তামাক নিয়ন্ত্রণ আইন, কৃষকদের বিকল্প ফসল উৎপাদনে সহায়তা, স্বাস্থ্য খাতের মতামতকে প্রাধান্য এবং সর্বোপরি কর্পোরেট স্বার্থের বাইরে জনস্বার্থকেন্দ্রিক রাজনীতি। ইন্টেরিমের নানাবিধ সংস্কারের তালিকায় তামাকের রাজনীতির সংস্কারের কোন পরিকল্পনা, এজেন্ডা কিংবা প্রস্তাবনা আছে কিনা আমরা জানিনা।
তথ্যযোগ:
Framework Convention on Tobacco Control (FCTC), WHO. Article 5.3 Guidelines.
National Board of Revenue (NBR), Bangladesh. (2023). Annual Tax Collection Report.
Prothom Alo. (2021). "Tobacco Companies’ Influence in Policy Making."
Transparency International Bangladesh (TIB). (2019). "Tobacco Industry Interference in Bangladesh."
UBINIG. (2021). "Tobacco Cultivation in Bangladesh: Health, Environment and Economy."
World Health Organization (WHO) Bangladesh. (2023). "Tobacco Control Factsheet."