বাংলাদেশের খেলাধুলার নিয়ন্ত্রক প্রতিষ্ঠান জাতীয় ক্রীড়া পরিষদের নির্বাহী পরিচালক অক্টোবর মাসের মধ্যে সারাদেশের জেলা ও বিভাগীয় ক্রীড়া সংস্থা সমূহের নির্বাচনের তফসিল ঘোষনার নির্দেশ দিলেও জেলা প্রশাসক ও বিভাগীয় কমিশনারগণ তা আমলে নেননি। ফলে সারাদেশের ক্রীড়াঙ্গনের অচলাবস্থায় আরও স্থবিরতা নেমে এসেছে। আহ্বায়ক কমিটি শক্তিশালী না হওয়ায় তৃণমূলের খেলাধুলা হারিয়ে যেতে বসেছে। বিশেষ করে জেলা পর্যায়ে বছরের পর বছর লিগ আয়োজন না করায় হাজার হাজার তরুণ ক্রিকেটারের সম্ভাবনায় ক্যারিয়ার ধ্বংস হয়ে যাচ্ছে।
জানাগেছে, ২০২৪ সালের ৫ জুলাই তৎকালীন আওয়ামীলীগ সরকারের পতনের পর গঠিত অন্তর্বর্তীকালীন সরকার ক্ষমতায় এসেই সারাদেশের জেলা ও বিভাগীয় ক্রীড়া সংস্থার কমিটি ভেঙ্গে দিয়ে আহ্বায়ক কমিটি গঠন করা হয়। ৭ সদস্যের কমিটিতে জেলা প্রশাসককে আহ্বায়ক এবং জেলা ক্রীড়া অফিসার অথবা যুব উন্নয়ন অধিদপ্তরের উপ-পরিচালককে সদস্য সচিব করা হয়। কমিটির অন্য ৪জন সদস্য নেওয়া হয় ক্রীড়াঙ্গন থেকে এবং একজন রাখা হয় ক্রীড়া সাংবাদিক। জেলা প্রশাসকগনের উদাসীনতায় এই কমিটি অনেক জেলাতেই সঠিকভাবে কার্যক্রম পরিচালনা করতে পারেনি। পরবর্তীতে বর্তমান সরকার ক্ষমতায় আসার পর আগের আহ্বায়ক কমিটি ভেঙ্গে দিয়ে নতুন করে আহ্বায়ক কমিটি গঠন করা হয়। কিন্তু এই কমিটিতে ক্রীড়াঙ্গনকে থেকে নেওয়া হয়েছে মাত্র দুজন। জেলা প্রশাসককে আহ্বায়ক করে ৫জন সরকারি আমলাকে সদস্য করা হয়। ফলে আগের কমিটির চেয়েও দূর্বল এই আহ্বায়ক কমিটি ক্রীড়াঙ্গনের উন্নয়নে তেমন কোন ভূমিকা রাখতে পারছে না। এমনকি বর্তমান সরকার ক্ষমতা গ্রহনের ৯ মাস অতিক্রম করলেও জেলা ক্রীড়া সংস্থা সমূহের নির্বাচন করতে পারেনি। ফলে সারাদেশের ক্রীড়াঙ্গনে চরম স্থবিরতা নেমে এসেছে।
উত্তর জনপদের প্রবেশদ্বার বগুড়া হলো খেলাধুলার উর্বর ভূমি। ক্রিকেট, ফুটবল, কাবাডি, সাঁতারসহ সবগুলো ইভেন্টে কৃতিত্বপূর্ন সাফল্য রয়েছে বগুড়ার খেলোয়াড়দের। বাংলাদেশ ক্রিকেট বোর্ড আয়োজিত অনুর্ধ্ব-১৪, ১৬ ক্রিকেট প্রতিযোগিতায় বছরের পর বছর বিভাগীয় পর্যায়ে চ্যাম্পিয়ন হয়ে আসছে বগুড়া। বিসিবির বয়সভিত্তিক জাতীয় দলেও বগুড়ার একাধিক ক্রিকেটার খেলছে। জাতীয় ক্রিকেট দলে বর্তমানে মুশফিকুর রহীম, তানজিদ হাসান তামিম এবং তাওহিদ হৃদয় প্রতিনিধিত্ব করছেন। নারী জাতীয় দলেও রয়েছেন বগুড়ার একাধিক ক্রিকেটার। অনেকেই জাতীয় দলের দরজায় কড়া নাড়ছেন। স্কুল ক্রিকেটেও রয়েছে বগুড়ার ঈর্ষনীয় সাফল্য। এবারের জাতীয় স্কুল ক্রিকেটের চ্যাম্পিয়ন হয়েছে বগুড়ার ব্যক্তি উদ্যোগে প্রতিষ্ঠিত বীট মডেল স্কুল এন্ড কলেজ। প্রতি বছর স্কুল ক্রিকেটে চ্যাম্পিয়ন অথবা রানার্স আপ হয়ে আসছে বগুড়া। এসব ক্রিকেটার তৈরির মূল মঞ্চ হলো জেলা ক্রীড়া সংস্থা। অথচ ২০২৩ সালের পর বগুড়ায় কোন ক্রিকেট লিগ আয়োজন করা হয়নি। অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের সময়ে গঠিত আহ্বায়ক কমিটি লিগ আয়োজনের উদ্যোগ নিলেও স্থানীয় ক্লাব কর্মকর্তাদের অনীহায় তা সম্ভব হয়নি। তবে, সেসময় জেলা ক্রীড়া সংস্থার আহ্বায়ক কমিটির উদ্যোগে জেলা প্রশাসক কাপ টি-টুয়েন্টি ক্রিকেট টুর্নামেন্ট, ক্লাব কাপ টি-টুয়েন্টি ক্রিকেট টুর্নামেন্ট এবং বয়স ভিত্তিক ক্রিকেটারদের নিয়ে একটি ইমার্জিং কাপ ক্রিকেট টুর্নামেন্ট আয়োজন করা হয়। এর পর আর কোন ক্রিকেট লিগ বা টুর্নামেন্ট আয়োজন করেনি জেলা ক্রীড়া সংস্থা। একই চিত্র রাজশাহী বিভাগের অন্য জেলাগুলোতেও। ২০২২ সালের পর কোন জেলাতে ক্রিকেট লিগ হয়নি। ফলে এসব জেলার হাজার হাজার উদীয়মান ক্রিকেটার সুযোগ বঞ্চিত হয়ে খেলা ছেড়ে দিতে বাধ্য হচ্ছে।
নাম প্রকাশ না করার শর্তে বগুড়া জেলা দলের একাধিক ক্রিকেটার জানান, ক্রিকেটারদের আয়ের প্রধান উৎস জেলার বিভিন্ন লিগ। কিন্তু বছরের পর বছর বগুড়ায় কোন লিগ আয়োজন না করায় শত শত ক্রিকেটার বেকার হয়ে মানবেতর জীবন যাপন করছেন। পেশাদার ক্রিকেটাররা যেহেতু অন্য কোন পেশায় যুক্ত থাকেনা সেকারনে ক্রিকেট খেলেই জীবন চালাতে হয়। বছরের পর বছর লিগ না হওয়ায় এসব ক্রিকেটারদের সংসারে অশান্তি নেমে এসেছে। হাতেগোনা কিছু ক্রিকেটার ঢাকায় বিভিন্ন ক্লাবের হয়ে খেলার সুযোগ পেলেও অধিকাংশই বেকার রয়েছেন। বর্তমানে এসব ক্রিকেটাররা পাড়া-মহল্লায় শর্টপীচ কিম্বা মারুতি বলের টুর্নামেন্টে খেলে কিছু রোজগার করছেন। বিসিবির জেলা ভিত্তিক জাতীয় প্রতিযোগিতা ছাড়া এসব ক্রিকেটারদের খোঁজও রাখেনা জেলা ক্রীড়া সংস্থা। ফলে অনেক প্রতিভাবান ক্রিকেটারের ক্যারিয়ার ধ্বংস হয়ে যাচ্ছে। বাংলাদেশও হারাচ্ছে সম্ভাবনাময় নতুন নতুন ক্রিকেটারকে। দীর্ঘ দিন জেলা ক্রীড়া সংস্থার নির্বাচন না হওয়ার কারনেই এমন পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছে বলে মনে করছেন ক্রিকেটাররা।
এদিকে, জাতীয় ক্রীড়া পরিষদের পক্ষ থেকে অক্টোবর মাসের মধ্যেই সারাদেশের জেলা, বিভাগ ও উপজেলা ক্রীড়া সংস্থা সমূহের নির্বাচনের তফসিল ঘোষনা এবং নভেম্বর মাসের মধ্যে নির্বাচন সম্পন্ন করার জন্য নির্দেমনা দেওয়া হলেও জেলা প্রশাসকগণ তা আমলে নেননি। গত ১৫ সেপ্টেম্বর জাতীয় ক্রীড়া পরিষদের নির্বাহী পরিচালক দৌলতুজ্জামান খান স্বাক্ষরিত চিঠি সারাদেশের জেলা প্রশাসক ও বিভাগীয় কমিশনারের নিকট পাঠানো হয়। কিন্তু এখনো বগুড়াসহ রাজশাহী বিভাগের কোন জেলায় ক্রীড়া সংস্থার নির্বাচনের তফসিল ঘোষনা করা হয়নি। জাতীয় ক্রীড়া পরিষদের নির্দেশ সত্তে¦ও জেলা ক্রীড়া সংস্থা সমূহের নির্বাচন আয়োজনে জেলা প্রশাসকগণ উদ্যোগ না নেওয়ায় ক্রীড়াবিদ, ক্রীড়া সংগঠকসহ ক্রীড়াপ্রেমিদের মাঝে অসন্তোষ দেখা দিয়েছে। বগুড়ার সাবেক ক্রিকেটার ও ক্রীড়া সংগঠক মাসুদ পারভেজ জেমস ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, ‘এই এ্যাডহক কমিটি ক্রিকেট ধ্বংস করে ফেললো। শহীদ চান্দু স্টেডিয়ামের সংস্কার কাজ শুরু হলে আগামী দুই বছর বগুড়ায় ক্রিকেট খেলার মত কোন মাঠ থাকবেনা। ডিসেম্বর পর্যন্ত সময় ছিল একটা লিগ কমপক্ষে আয়োজন করা যেতো।’
রাজশাহী বিভাগীয় আম্পায়ার্স এসোসিয়েশনের সভাপতি খালেদ মাহমুদ রুবেল বলেন, ‘দীর্ঘ দিন ক্রিকেট লিগ না হওয়ায় শুধু তরুণ ক্রিকেটাররা ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন তা নয়, ক্রিকেটারদের পাশাপাশি আম্পায়ারদেরও কঠিন সময় যাচ্ছে। অনেকে আম্পায়ারিং করেই জীবন যাপন করে থাকেন। এসব আম্পায়াররা মানবেতর জীবন যাবন করছেন। নির্বাচনের মাধ্যমে ক্রীড়া সংস্থার কমিটি গঠিত না হলে আহ্বায়ক কমিটির পক্ষে লিগ আয়োজন করা সম্ভব নয় এটা প্রমানিত। যত দ্রুত সম্ভব ক্রীড়া সংস্থার নির্বাচন আয়োজনের জন্য আম্পায়ারদের পক্ষ থেকে জাতীয় ক্রীড়া পরিষদের নিকট জোর দাবী জানাচ্ছি।’
এবিষয়ে বাংলাদেশ জেলা ও বিভাগীয় ক্রীড়া সংগঠক এসোসিয়েশনের সাধারন সম্পাদক ও বাংলাদেশ সুইমিং ফেডারেশনের সাধারন সম্পাদক সৈয়দ আমিনুল হক দেওয়ান সজল বলেন, সারাদেশে ক্রীড়াঙ্গন সচল করতে দ্রুততম সময়ের মধ্যে জেলা ও বিভাগীয় ক্রীড়া সংস্থার নির্বাচনের জন্য আমরা ক্রীড়া প্রতিমন্ত্রী এবং জাতীয় ক্রীড়া পরিষদকে তাগিদ দিয়েছি। আশা করা যায় অল্প সময়ের মধ্যে নির্বাচন সম্পন্ন হবে।
এদিকে, জাতীয় ক্রীড়া পরিষদের নিদেশ পাওয়ার পরেও নির্ধারিত সময়ে জেলা ক্রীড়া সংস্থার নির্বাচন আয়োজনের উদ্যোগ কেন নিলেন না এমন প্রশ্নে বগুড়ার জেলা প্রশাসক ও জেলা ক্রীড়া সংস্থার আহ্বায়ক তৌফিকুর রহমান বলেন, উপজেলা ক্রীড়া সংস্থাগুলো এখনো গঠিত হয়নি। উপজেলা ক্রীড়া সংস্থার প্রতিনিধিগণ যেহেতু জেলা ক্রীড়া সংস্থার নির্বাচনে কাউন্সিলর হন, সেকারনে উপজেলা ক্রীড়া সংস্থার অনুমোদন হওয়ার আগে জেলা ক্রীড়া সংস্থার নির্বাচন করা সম্ভব হচ্ছে না।
দেশের খেলাধুলার সুতিকার হলো জেলা ক্রীড়া সংস্থা। ফুটবল ছাড়া অন্য সব খেলার নিয়ন্ত্রণ করে জেলা ক্রীড়া সংস্থা। এই জেলা ক্রীড়া সংস্থা সচল রাখতে না পারলে দেশের খেলাধুলার উন্নয়ন সম্ভব নয়। আহ্বায়ক কমিটিগুলো শক্তিশালী না হওয়ায় ক্রীড়া সংস্থা সমূহের নির্বাচন অতীব জরুরি হয়ে পড়েছে। নির্বাচিত ক্রীড়া সংস্থা ছাড়া ক্রীড়াঙ্গনের চলমান স্থবিরতা কাটানোর অন্যকোন উপায় নেই। সরকারের ক্রীড়া মন্ত্রণালয় এবং জাতীয় ক্রীড়া পরিষদ যততম সময়ে সারাদেশের ক্রীড়া সংস্থা সমূহের নির্বচানের ব্যবস্থা করে ক্রীড়াঙ্গনকে রক্ষা করবেন এটাই সকলের প্রত্যাশা।