২০ বৈশাখ, ১৪৩৩

০৩ মে, ২০২৬

তিনি মঙ্গলবার রাতে জার্মানীতে ইন্তেকাল করেছেন

জাতীয় ফুটবল দলের সাবেক গোল কিপার বগুড়ার কৃতিসন্তান ফজলু ভাই

প্রত্যাশা প্রতিদিন প্রকাশিত: এপ্রিল ৯, ২০২৫, ১১:০৬ পূর্বাহ্ন
জাতীয় ফুটবল দলের সাবেক গোল কিপার বগুড়ার কৃতিসন্তান ফজলু ভাই


এক সময়ের, বগুড়া জেলা দল, ঢাকা আবাহনীর চৌকস গোলরক্ষক এবং জাতীয় ফুটবল দলের গোল কিপার বীর মুক্তিযোদ্ধা ফললুল করিম ফজলু জার্মানীতে ইন্তেকাল করেছেন। ইন্না লিল্লাহি ওয়া ইন্না ইলাইহি রাজিউন।  মঙ্গলবার বাংলাদেশ সময় রাত নয়টায় ইন্তেকাল করেন।


বগুড়ার জ্বলেশ্বরীতলায় নিজ বাসভবন ইনডিপেনডেন্ট হাসপাতালের সামনে)। নিউমার্কেটের তুষান বস্ত্রালয় বিতান মালিক এর ছোট ভাই এই ফজলুল করিম। বাবা জেলা রেজিস্ট্রি অফিসে চাকরি করতেন। আদিবাড়ি (ক্ষেতলাল) জয়পুর হাট হলেও। বগুড়ায় সেটেল্ড হয়েছিলেন পৈতৃক সুত্রে অনেক আগেই।


ছাত্র জীবন:
বগুড়া জিলা স্কুল থেকে তিনি ১৯৬৭ইং সালে মেট্রিক পাশকরেন। ১৯৬৯ইং সালে আজিজুল হক কলেজ থেকে উচ্যমাধ্যমিক পাশ করে রাজশাহী ভার্সিটিতে ভর্তি হন। সেখান থেকে ঢাকা ইউনিভার্সিটিতে ট্রান্সফার হয়ে পড়া লেখা জিবন শেষ করেন।

খেলোয়াড়ী জীবন:
ইন্টার স্কুল দিয়ে ফুটবল শুরু। কিশোর কালেই সবার নজরে পরেন প্রতিভাবান এই গোলরক্ষক। ততকালে সহপাঠিদের অনুপ্রেরনা আর বগুড়ার কিংবদন্তী ফুটবলার বড় কালু খাঁ, ছোট কালু, আইনুল, সাইফুল, শহজাহান, আবেদুর রহমান নান্টু, আলফাজ আহমেদ গেদা, অমলেশ সেন, আফজাল, চাঁন্দু, লাল, পেস্তা সহ প্রমুখ খেলোয়াড় ছিলেন তার আইকন। মেট্রিক পাশ এর আগেই বগুড়ায় লীগ খেলা শুরু করেন ঐতিহ্যবাহী টাউন ক্লাবের হয়ে। তারই মধ্যেই সবার নজরে পড়েন। তিনি নিজ যোগ্যতা বলে ১৯৬৮ ইং সালে জেলা দলে সুযোগ পান। 


বিশেষ কৃতিত্ব: বগুড়া জেলা দল ১৯৬৯ ইং সালে জাতীয় ফুটবলে ইষ্ট পাকিস্থান চ্যাম্পিয়ন হয়। এই ফজলুল করিম ছিলেন সেই দলের ১নাম্বার গোলকিপার। আর মরহুম আনিছুর রহমান কমিশনার ছিলেন ২নং কিপার। 


ভার্সিটিতে পড়ার সময় ফজলুল করিম জ্বলে উঠলেন।সুনাম আর খ্যাতি ছড়িয়ে পড়লো চারিদিকে। তখনই নজরে পড়ে ঢাকা মাঠের ফুটবলের প্রানপুরুষ বগুড়ার স্বর্গীয় অমলেশ সেনের। তিনি তাকে রাজশাহী থেকে ঢাকা ভার্সিটিতে পার করেন এবং কম্বাইন্ড ইউনিভার্সিটি টিমে খেলান। তারও আগে ফজলুল করিম নিজে এবং অমলেশ,  সামাদ,আফজাল জয়পুরহাট সুগার মিলে ফুটবলার হিসাবে চাকরিও করেন। ব্যাস ঐ শুরু হলো ফজলুর উপরে ওঠা। আর পিছন ফিরে তাকাইতে হয়নি। প্রসংগক্রমে উল্লেখ্য ফজলুল করিম একজন ভাল মানের বাস্কেটবল খেলোয়াড় হিসাবে ঢাকা লীগে ভিক্টোরিয়া এবং ওয়ান্ডার্স ক্লাবে খেলতেন।

ঢাকার মাঠে ফজলুল করিম:
দেশে স্বাধীনতার পূর্বেই ফুটবলে আধুনিকতার ছোঁয়া লেগেছিল। সত্তর দশকের শেষদিকে ততকালে পূর্বপাকিস্তানে কিছু চৌকস ফুটবলারের আবির্ভাব হয়। নিঃসন্দেহে তাঁরা বিশ্বমানের খেলোয়াড় ছিলেন। জাকারিয়া পিন্টু, সালাউদ্দিন, নান্নু, মন্জু, প্রতাপ সংকর হাজরা, কায়কোবাদ, শামছু, কাজী সাত্তার, কাজী আনোয়ার, আশরাফ, আঃ রহীম, শহীদুর রহমান সান্টু, জাসদ নেতা সাবেক মন্ত্রী হাসানুল হন ইনু, নিজাম, মোত্তালিব, আঃ গফুর,চুন্নু, অমলেশ সেন, আফজাল, রামা লুশাই, বাটু, নওশের, হাফিজ উদ্দিন, এনায়েত, আশিষ ভদ্র, জাহাঙ্গীর শাহ বাদশাসহ আরো অনেকেই তখন চোখ ধাঁধানো ফুটবল খেলতেন। আমাদের বগুড়ার ফজলুল করিমও সেই সকল তারকাদের কাতারভুক্ত হন ১৯৬৯ সালে। সেই অমলেশ সেন এর হাত ধরেই। এক ঝাঁক সোনালী নক্ষত্ররা স্বাধীনতার পরেও তাঁদের আলোর ঝলকানি অব্যাহত রেখেছিলেন। যা আজ নিভে গিয়ে ঘুটঘুটে অন্ধকার। 


ফজলু ১৯৬৯ সালে প্রথমে ইষ্ট এ্যান্ড ক্লাবে খেলেন। তখন অমলেশ সেন, আফজাল এবং বর্তমান জাসদ নেতা সাবেক মন্ত্রী হাসানুল হক ইনু ছিলেন ঐ ক্লাবের গোলকিপার। পরে ইনু সাহেব মোহমেডান ক্লাবে চলে যান এবং  ফজলুল করিমও পর্যায়ক্রমে ভিক্টোরিয়া, পি,ডাব্লু,ডি, ওয়াপদা, রহমগঞ্জে খেলে শেষে আবাহনী ক্লাবে যোগ দেন। তখন আবাহনীর কিপার ছিলেন নিজাম উদ্দিন। সাথে ছিলেন বগুড়ার অমলেশ সেন এবং আফজাল হোসেন।  তার আগে তিনি তিনবার জাতীয় দলে সুযোগ পান। তখন রংপুরের শহীদুর রহমান শান্টু ছিলেন ১নং কিপার। ১৯৭৪ সালে মস্কোর সাথে খেলে তিনি ভূয়সী প্রশংসা পান। সবাই তখন তার প্রশংসায় পঙ্চমুখ। এরপর মোহমেডানের সাথে খেলার সময় গুরুতর আঘাতে তার চোয়াল ভেঙ্গে যায়। বেশ কিছু সময় তখন খেলার বাইরে থাকতে হয় বাধ্য হন।


মুক্তিযোদ্ধা ফজলু করিম:
স্বাধীন বাংলা ফুটবল টিমে সুযোগ পেয়েও তিনি ইনু সাহেবের সাথে ভারতের দেরাদুন ক্যাম্প থেকে ট্রেনিং নিয়ে দেশে এসে মুক্তিযুদ্ধে অংশ নেন। সাথে ছিলেন শহীদ চাঁন্দু এবং জাসদের বগুড়ার নেতা রতনসহ অনেকে। যুদ্ধ শেষে স্বাধীন বাংলাদেশের সোনার ছেলে ঢাকা ষ্টেডিয়ামে অস্ত্র জমা দিয়ে আবার ছাত্রজীবন এবং খেলার মাঠে নেমে পড়েন।

জার্মানে চলে গেলেন ফজলু:
আবাহনী ক্লাবে থাকা কালীন তিনি চিটাগাং লীগেও খেলতেন। ১৯৭৬/৭৭ইং সালে আত্মীয় স্বজন, বন্ধু-বান্ধব এমন কি ক্লাবকেও কিছু না জানিয়ে চিটাগাং খেলতে যাওয়ার কথা বলে এক কাপরে খেলার ব্যাগ ঘাড়ে নিয়ে পশ্চিম জার্মানীতে পারি জমান। কারন বা বিষয়টি আজো অজানায় রয়ে গেছে।হয়তো খেয়ালী মনের বেখেয়ালি  খেলা!!
মাঝে মাঝেই বগুড়া এলেও তিনি জার্মানেই স্থায়ী ভাবে বসবাস করতেন। জার্মানি স্ত্রী, তিন কন্যা, জামায়, দুই নাতনী নিয়ে বেশ ভালই ছিলেন ফজলুল করিম। বগুড়ায় এলেই পুরা পরিবার সহ খেলার মাঠে আসতেন খেলা পাগল এই মানুষটি।

বড় আফসোস! তিনি মাঝে মাঝেই আমাকে কল করতেন। আজ থেকে কয়েকদিন আগেই ভি,ডি,ও কলে কথা বললেন। সাথে ভাবিও পরিস্কার বাংলায় কথা বললেন। আমি বললাম আপনাকে দেখতে আজ বেশ সুস্থ বেশ চমৎকার লাগছে। তিনি হাসলেন আর বললেন শহীদুল বিভিন্ন রোগে আমি দিশেহারা। বিশেষ করে তিনি পারকিন্স রোগে আক্রান্ত হওয়ায় হুইল চেয়ারে সর্বদায় বাসাতেই থাকতেন। তিনি মঙ্গলবার বাংলাদেশ সময় রাত নয়টায় ইন্তেকাল করেন। ইন্না লিল্লাহি ওয়া ইন্না এইলাইহি রাজিউন। 


পরিশেষে আমরা সবাই আমাদের বগুড়াবাসী তথা দেশের গর্ব বীরসন্তান মরহুম ফললুল করিম ফজলু ভাইয়ের জন্য দোয়া করি। মহান আল্লাহ ভাইকে ভূলত্রুটি মাফ করে জান্নাতবাসী করুন। আমিন।


মোঃ শহীদুল  ইসলাম
সাবেক ক্রিড়াবিদ ও সাধারন সম্পাদক 
জেলা ক্রীড়া সংস্থা, বগুড়া।